‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি পোপ

45

ক্যাথলিক গির্জার সতর্ক আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি পোপ ফ্রান্সিস। কিন্তু কূটনৈতিক কায়দায় শক্তিশালী এক বক্তব্যে তিনি সব নৃগোষ্ঠীর প্রতি সম্মান ও সমাজে সবার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।ক্যাথলিক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মগুরু পোপ গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে দেশটির সরকার, নাগরিক সমাজ ও কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ অবশ্যই শান্তিপূর্ণ হতে হবে। এ শান্তির ভিত্তি হতে হবে সমাজের প্রতিটি সদস্যের সম্মান ও অধিকার, প্রতিটি নৃগোষ্ঠী ও তার পরিচয়কে সম্মান দেখানো, আইনের শাসন এবং এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সম্মান  প্রদর্শন যেখানে সবার মঙ্গলের জন্য প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রত্যেক গোষ্ঠীর বৈধভাবে ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকে এবং কেউ বাদ না পড়ে। ’পোপ যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন সেখানে উপস্থিত ছিলেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। আর মঞ্চের সামনের সারিতে বসে বক্তব্য শুনছিলেন শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তা ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা।

পোপ ফ্রান্সিস বলেন, মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনগণ। অভ্যন্তরীণ বিবাদ ও বৈরিতার কারণে তারা অতীতে অনেক দুর্ভোগ সহ্য করেছে, এখনো করছে। অভ্যন্তরীণ বিবাদ ও বৈরিতা মিয়ানমারে অনেক বেশি সময় ধরে চলছে এবং সমাজে বড় বিভাজন সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র (মিয়ানমার) এখন শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে। আর এ সময় সেই ক্ষতগুলো নিরাময় করা অবশ্যই রাজনৈতিক ও আত্মিক অগ্রাধিকার হতে হবে।

’ তিনি আরো বলেন, ‘ধর্মীয় পার্থক্য বিভাজন ও অবিশ্বাসের কারণ হওয়া উচিত নয়। বরং তা হওয়া উচিত ঐক্য, ক্ষমা, সহনশীলতা ও বুদ্ধিমান জাতি গঠনের শক্তি। ’পোপ ফ্রান্সিস আগে বিভিন্ন সময় ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেই তাদের ‘ভাই’ ও ‘বোন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং রোহিঙ্গাদের দুর্দশা লাঘবের জন্য প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের তার দেশের নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। মিয়ানমারের সরকার ও জনগণের বড় একটি অংশ ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করারও বিপক্ষে। এ অবস্থায় মিয়ানমার সফরের সময় ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি প্রকাশ্যে উচ্চারণ না করতে পোপকে পরামর্শ দিয়েছিল তাঁর ক্যাথলিক গির্জাই। পোপ শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারে গিয়ে কিভাবে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের দুর্ভোগের প্রসঙ্গ তোলেন সে দিকে দৃষ্টি ছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। মিয়ানমারে গিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুটি এড়িয়ে গেলে পোপের জন্য নৈতিক পরাজয় হতো। আবার রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের কথা বলতে গিয়ে পোপ ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ উচ্চারণ করলেও মিয়ানমারের সংখ্যালঘু ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের সদস্যদের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে পোপ তাঁর সফরের দ্বিতীয় দিন কৌশলে রোহিঙ্গাসহ সব নৃগোষ্ঠীর অধিকারের প্রসঙ্গ তুলেছেন।

ইয়াঙ্গুনে বিবিসির সংবাদদাতা জনাথন হেড জানান, পোপ তাঁর সফরের প্রথম দিন গত সোমবার সন্ধ্যায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান এবং গতকাল সকালে উগ্র জাতীয়তাবাদী এক বৌদ্ধ নেতার সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পোপ আরো স্পষ্টভাষী হয়ে থাকতে পারেন।সফরসূচি অনুযায়ী পোপ আজ বুধবার ইয়াঙ্গুনে প্রার্থনায় অংশ নেওয়া ছাড়াও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সুপ্রিম কাউন্সিল এবং বিশপদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তিনি আগামীকাল তরুণদের প্রার্থনায় যোগ দেবেন। এরপর দুপুরে ইয়াঙ্গুন থেকে রওনা হয়ে বিকেল ৩টায় পোপের বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। পোপ বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী বীর শহীদদের প্রতি ঢাকার সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে এবং ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। আগামীকাল সন্ধ্যায় পোপ বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ, নাগরিক সমাজ ও কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেন।

পোপ আগামী শুক্রবার সকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রার্থনায় অংশ নেবেন এবং বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া পোপ অনাথ, মাদকাসক্ত, মিশনারি স্কুলের শিক্ষার্থী, রোহিঙ্গা, অন্য ধর্ম ও মণ্ডলীর সদস্যদের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎ করবেন। আগামী শনিবার বিকেল ৫টার দিকে রোমের উদ্দেশে পোপের ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে